বাবার স্মরণে
আমার বাবা ছিলেন না কোন মন্ত্রী,মিনিষ্টার।কিংবা জর্জ ব্যারিষ্টার।অথবা ছিলেন না অটেল সম্পত্তির মালিক।তবে আমি মাথা উঁচু করে বলতে পারি,আমার বাবা ছিলেন স্কুল মাষ্টার।অতি সাধারণ জীবন যাপন করেছেন।সততা,সবর এবং ন্যায় নীতি ছিল বাবার আদর্শ।কাজের প্রতি ছিলেন বাবা যথেষ্ট নিষ্টাবান।বাড়ির পাশেই ছিল প্রাইমারী স্কুল।এই স্কুলটি ছিল আব্বার আরেকটা পরিবার।স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা ছিল তার কাছে সন্তান তুল্য।সহকর্মীর প্রতি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী এবং বন্ধুসুলভ।শিক্ষাদান কাজে ছিলেন অশেষ পারদর্শী।প্রতিটি ক্লাস এত হাসি খুশির মাধ্যমে প্রানবন্ত করে উপস্হাপন করতেন,যার দরুন ছাত্র ছাত্রীরা তার ক্লাসে বেশি মনোযোগী থাকতো।সব শিক্ষকের মতো তিনিও সমান তালে ক্লাস নিতেন।অথচ আজ কাল প্রধান শিক্ষকদের তো ক্লাস নিতে দেখাই যায়না।অফিসিয়েল কাজের অজুহাতে এই দায়িত্ব থেকে সরে থাকেন।
বাবা দিবসে আব্বার অনেক স্মৃতিই মনে পড়ছে।তবে যে স্মৃতিগুলো বারবার আমার চোখে ভেসে উঠে—-
বাচ্চাদের যাতে মশা না কামড়ায় সেদিকে আব্বা খুব খেয়াল করতেন।রাতে ঘুমানোর সময় বারবার বলতেন,মশারির পাড়টা যেন বিছানার নিচে ভালো করে ঢুকিয়ে রাখি,যাতে মশা ঢুকতে না পারে।রাতে ঘুম থেকে উঠে চেক করতেন,মশারির ভিতরে মশা ঢুকলো কিনা।
ছেলে,মেয়েরা রাতে না খেয়ে শুয়ে থাকা আব্বা মোটেও পছন্দ করতেন না।ছোট ছোট ভাই বোন আমরা হয়ত পড়তে পড়তে শুয়ে পড়ছি।মা ভাবতেন,থাক বাচ্চা মানুষ,শুয়ে পড়েছে শুয়ে থাক।ডাকার দরকার নেই।কিন্তু আব্বা আমাদের ডেকে উঠাতেন।আব্বা বলতেন,রাতে না খেলে নাকি (এক চড়ার গোস্ত কমে) এক পাখির মতো মাংস কমে।
আব্বার যে স্মৃতি আমার বেশি মনে হয় তা হলো,আব্বার জন্য আমার জীবন ফিরে পেয়েছি।আমি তখন সাঁতার জানতাম না।রাস্হার পাশে দুটো পুকুর ছিল।ছোট ভাইকে নিয়ে প্রথম পুকুরে গোসল করতে লেগেছি।গোসল করতে করতে তো পানিতে ডুবে যাওয়ার উপক্রম।আশে পাশে কেউ ছিলোনা।আমরা তো দুজন পানি খেতে খেতে শ্বাস নিতে পারছিলাম না।ঐসময় আব্বা পাশের পুকুর থেকে গোসল সেরে পা ধুইতে এলেন এই পুকুরে।আব্বা খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতেন।পাশের পুকুর ঘাট থেকে হেটে এসে উনার মনে হলো,পায়ে বালি লেগেছে।আর তাই বালি সারাতে আবার এই পুকুরে এলেন।আল্লাহ রক্ষা করেছেন আব্বা এসে যেই আমাদের ঐভাবে দেখলেন,চিৎকার করে লোক জমা করলেন।তারপর অনেকে এসে আমাদের উদ্ধার করলো।এই স্মৃতি মনে হলে এখনও ভয়ে গা কাঁপে।
১৯৮৫ সালের ২৭ শে আগষ্ট,কুরবানীর ঈদের দিন আমার আব্বা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।তার মৃত্যুতে এলাকাবাসী,স্কুলের ছাত্র অভিভাবক সবার মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া।আমার আব্বার প্রতি সকলের এই শ্রদ্ধাবোধ এই মমতা তুলনাহীন।আল্লাহ আমার আব্বাকে জান্নাতবাসী করুন।
পৃথিবীতে মা বাবার ভালোবাসার তুলনা নেই।এরাই পারে একমাত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিতে।শরীরের রক্ত দিয়েও বাবা সন্তানের সুখ চায়।সন্তানের সব চাওয়া,পাওয়া পূরণ করেন।সম্রাট বাবর তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে সন্তানের জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলেন।পৃথিবীতে সেই ভাগ্যবান,যে বাবা মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাভাজন হয়।থাকে বাবার স্নেহ ছায়ায়।সেই হতভাগা,যে বাবা মায়ের কদর বুঝেনি।তাদেরকে কষ্ট দেয়।পৃথিবীর সব বাবারা ভালো থাকুন।বাবা দিবসে জানাই সকল বাবাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
লেখিকা-শাহারা খান
যুক্তরাজ্য প্রবাসী






